Thoughts after reading OITIHAS O ITIHAS CHINTA Shri Subhankar Kudu
ইতিহাস শব্দটি এসেছে ‘ঐতিহ্য’ শব্দ থেকে। যার অর্থ হল – ‘অতীতে যা ঘটেছিল’। ইংরেজি ‘History’ অর্থে ইতিহাস শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ‘History’ শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ ‘Histor’ অর্থাৎ ‘জ্ঞান’ এবং গ্রিক শব্দ ‘Historia’ অর্থাৎ ‘সযত্ন অনুসন্ধান’ শব্দ থেকে। অপরদিকে যে ব্যক্তি এই ইতিহাস বা অতীত নিয়ে গবেষণা করে থাকেন, তাকেই সাধারণত ‘ঐতিহাসিক’ বলে। ইতিহাসের জনক বলে পরিচিত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস প্রথম ‘History’ শব্দটি ব্যবহার করেন । সুতরাং, বেশ বোঝা যাচ্ছে যে, ‘ইতিহাস’ ও ‘ঐতিহাসিক’ শব্দ দুটি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ঐতিহাসিকরাই তাঁদের গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে অর্থাৎ অতীতকে বর্ণনা করে থাকেন। একই বিষয় নিয়ে নানান ঐতিহাসিকদের আলোচনাও নতুন কিছু নয়। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় হল ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে, ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। আর তাইতো জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক, সাম্রাজ্যবাদী ঐতিহাসিক, মার্কসবাদী ঐতিহাসিক, নিম্নবর্গীয় ঐতিহাসিক প্রভৃতি ঘরানা ঐতিহাসিকদের মধ্যে দেখা যায়। যারা কিনা ইতিহাসকে নানান দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করেছেন।
এই ইতিহাস এবং ঐতিহাসিকদের নিয়েই একটি সংকলিত বই হল ‘ঐতিহাসিক ও ইতিহাস চিন্তা’। সংকলিত বইটি দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে আছে, ভারতীয় বিশেষত বাঙালি ঐতিহাসিকদের জীবনী ও কর্মজীবন এবং দ্বিতীয় ভাগে আছে, ইতিহাস চিন্তা নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রবন্ধ। আর এই ঐতিহাসিকদের সম্পর্কে কলম ধরেছেন দুই খ্যাতনামা জনপ্রিয় অধ্যাপক, গবেষক জহর সেন ও নির্বাণ বসু।
অধ্যাপক সেন আলোচনা করেছেন ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, ঐতিহাসিক নির্মলচন্দ্র সিংহ, ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠী ও ঐতিহাসিক ভেরিয়ার এলুইনকে নিয়ে। তাঁর লেখায় দেখা গেছে এই খ্যাতনামা ঐতিহাসিকদের জীবনী, জীবনদর্শন, ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁদের পুস্তক ও প্রবন্ধের তালিকা ইত্যাদি।
অপরদিকে, অধ্যাপক বসু আলোচনা করেছেন ইতিহাসবিদ হরিদাস মুখোপাধ্যায়, ইতিহাস সাধক হরপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ঐতিহাসিক সব্যসাচী ভট্টাচার্য, ঐতিহাসিক বিনয়ভূষণ চৌধুরী ও ইতিহাসবিদ নিশীথরঞ্জন রায়কে নিয়ে। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, কর্মজীবন, গবেষণা নিয়ে লিখেছেন ও সবশেষে তাঁদের পুস্তক ও প্রবন্ধের তালিকা যুক্ত করেছেন অধ্যাপক বসু তাঁর লেখায়। নজিরবিহীন একটি সংযোজন দেখা গেছে ঐতিহাসিক বিনয়ভূষণ চৌধুরীকে নিয়ে লিখিত অংশটিতে। সেখানে অধ্যাপক চৌধুরীর কাছে গবেষণা হয়েছে এমন বিষয় ও গবেষকের নাম উল্লিখিত আছে। যা ইতিহাসের যেকোনো গবেষকের গবেষণার কাজে বিষয় সম্পর্কে জানার ও পূর্ব অভিজ্ঞতার জন্য সহায়তা করতে পারে।
‘ইতিহাস চিন্তা’ নামে দ্বিতীয় অংশটিতে আছে যথাক্রমে - স্যার যদুনাথ সরকার লিখিত ‘ইতিহাস চর্চার প্রণালী’ নামে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ, অমলেন্দু দে-র লিখিত ‘ইতিহাস রচনায় মানুষের প্রতি মমতা চাই’, জহর সেনের ‘নিম্নবর্গের ইতিহাস ও ইতিহাসের মূল্যবোধ’, রামচন্দ্র গুহর ‘২০০৮: ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছর’, নিরঞ্জন হালদারের ‘অনাবাসী ঐতিহাসিকদের মিথ্যা ইতিহাস’, নির্বাণ বসুর ‘বাংলার রাজনৈতিক অধঃপতনের ইতিহাস’ ও সজল বসুর ‘আড্ডার গল্পে অজানা ইতিহাস’ নামে প্রবন্ধ।
ইতিহাস এমন একটি বিষয় যা আমাদের সামনে অতীতকে তুলে ধরে। কিন্তু, একটা কথা মনে রাখতে হবে যে এই অতীতের সত্যি কাহিনী তুলে ধরা অত সহজ নয়। এর জন্য বহু ঐতিহাসিককে বাধা পেতে হয়েছে। তবুও তাঁরা থেমে থাকেন না। এমনই এক সত্যবদ্ধ ঐতিহাসিক ছিলেন আচার্য স্যার যদুনাথ সরকার। যিনি তাঁর কাজকে সাধনার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। দৃঢ় প্রত্যয়ী এই ঐতিহাসিক মনে করতেন যে, ‘সত্য প্রিয় হউক, আর অপ্রিয় হউক, সাধারণের গৃহীত হউক আর প্রচলিত মতের বিরোধী হউক, তাহা ভাবিব না। আমার স্বদেশ গৌরবকে আঘাত করুক বা না করুক, তাহাতে ভ্রুক্ষেপ করিব না। সত্য প্রচার করিবার জন্য সমাজে বা বন্ধুবর্গের মধ্যে উৎসাহ ও গঞ্জনা সহিতে হয়, তাহা সহিব। কিন্তু, তবুও সত্যকে খুঁজিব, বুঝিব, গ্রহণ করিব’। একজন প্রকৃত ঐতিহাসিক সর্বদা সত্যকে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন বা করেন। আর তাইতো ইতিহাস রচনায় ঐতিহাসিককে হতে হয় নিরপেক্ষ। ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু পাঠকের কাছে তাই ঐতিহাসিককে জানা, তাঁর সম্পর্কে পড়া একান্ত জরুরী। আর এই বইটি পাঠকের এই খিদে মেটাতে পারবে বলে আশা রাখি। একইসঙ্গে সাধুবাদ জানাতে হবে বসুধানন্দ বুকস্ এ্যাণ্ড পাবলিকেশনের কর্ণধার বিশাল রাইকে। এরকম গবেষণাধর্মী সংকলিত বই, গবেষণা মূলক বই যাতে ভবিষ্যতে এই প্রকাশনা থেকে আরও বেরোতে পারে প্রকাশকের কাছে এই আশাই রাখি।
শুভঙ্কর কুণ্ডু
পিএইচডি গবেষক
ইতিহাস বিভাগ
কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়
 (2).png)